Search Header Logo
বিধু মাস্টার

বিধু মাস্টার

Assessment

Presentation

Fun

4th Grade

Hard

Created by

Srilekha Kumar

Used 3+ times

FREE Resource

11 Slides • 0 Questions

1

বিধু মাস্টার

By Srilekha Kumar

media

2

​বিধু মাস্টারের কথা আমি কখনো ভুলতে পারব না। মাত্র ক-টা মাস তিনি আমার কাছে এসেছিলেন, তারপর চলে গেলেন।

বেশ মনে আছে, সে দিনটা ছিল রবিবার। আমি সকাল বেলা কৌমুদী খুলে ধাতুরূপ মুখস্থ করছি চোখ বন্ধ করে দুলে দুলে, এমন সময় বাইরে কে যেন ডাকলেন, হারাণবাবু আছেন? হারাণবাবু!

আমি জানলা দিয়ে মুখ বার করে প্রশ্ন করলুম, কাকে চাই?

—এখানে হারাণবাবু বলে কি কেউ থাকেন?

—থাকেন। তিনি আমার কাকা।

—তাঁকে একবার ডেকে দাও তো।

—কী দরকার?

—তাঁর কি একজন টিউটর চাই?

media

3

সত্যিই তো, মেজোকাকা আমাদের জন্য একজন টিউটর চাই বলে খবরের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন।

—হ্যাঁ।

—তা ভেতরে এসে বসুন।

ছিপছিপে, লম্বা, কালোপানা লোকটা অত্যন্ত দ্বিধায়, অতিসন্তর্পণে আমাদের বৈঠকখানায় প্রবেশ করলেন। আনাড়ি লোকটাকে দেখে আমার মাস্টারের প্রতি সকল শ্রদ্ধা তিরোহিত হল। মেজোকাকা উঠে এলেন, আমিও এলুম তাঁর পিছু পিছু, আর এল ঝন্টু, মিন্টু চাঁদু ও রেবা। মেজোকাকা বৈঠকখানায় ঢুকতেই তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে হাতজোড় করে তাঁকে নমস্কার করলেন। মেজোকাকা বললেন, আপনি তো আজ সকালের কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে আসছেন?

তিনি বললেন, হ্যাঁ।

মেজোকাকা আবার বলতে আরম্ভ করলেন, এই পাঁচটি ছেলে-মেয়েকে পড়াতে হবে। রাতে তিন ঘণ্টা। মাইনে তো লিখেই দিয়েছি—সাত টাকা। কামাই চলবে না।

media

4

তিনি বললেন, না কামাই করবই-বা কেন?

মেজোকাকা বললেন, তা আপনি থাকেন কোথায়?

—শ্রীনাথ দাস লেনে।

—আপনার নাম?

—শ্ৰীবিধুভূষণ চট্টোপাধ্যায়।

—কদ্দূর লেখাপড়া আছে?

—ম্যাট্রিক পাস। কথাটা শুনে মেজোকাকা ঠোঁট কামড়াতে লাগলেন, টেবিলের ওপর বারকয়েক ডান হাত দিয়ে আঘাত করলেন, তারপর বললেন, আপনি ফোর্থ ক্লাসের ছেলেকে পড়াতে পারবেন তো?

5

​ফোর্থ ক্লাসে পড়ি কেবল আমি। এদের দলের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে বড়ো। আমার বুক গর্বে ফুলে উঠল। আমি বিধু মাস্টারের মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলুম। তিনি বললেন, তা আর পারব না কেন?

মেজোকাকা বললেন, বেশ ভালো। সোমবার থেকে কাজে লাগবেন। সন্ধ্যা ছটার সময় ঠিকমতো আসবেন। তারপর আমাদের বললেন, ইনি তোদের নতুন মাস্টার, এনার কাছে মন দিয়ে পড়বি, বুঝলি?

তারপর সোমবার দিন তিনি এলেন ঠিক ছ-টার সময়ে। আমাদের সকলের নাম জিজ্ঞেস করলেন—আমাদের বইগুলো উলটে-পালটে দেখলেন—বেশিক্ষণ দেখলেন আমার ইংরেজি বইখানা। বললেন, বেশ শক্ত বই পড়ানো হয় তো!

একদিন আমি জিজ্ঞেস করলুম, মাস্টারমশাই, পাহাড়ের হাইট মাপতে গেলে ব্যারোমিটার কী দরকার লাগে?

media

6

​তিনি বললেন, দরকার লাগে নাকি? কে বলল?

–স্কুলের মাস্টার।

–তা হবে, কোথায় লেখা আছে বলো তো?

—সায়েন্সের বইতে।

—দেখি সায়েন্সের বই!

আমি তাঁর হাতে বইখানা তুলে দিয়ে বললুম, কিছুই বুঝতে পারিনি মাস্টারমশাই।

তিনি বইয়ের পাতা খুলতে খুলতে বললেন, বেশ, বুঝিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু আমায় বোঝানো দূরের কথা, তিনি নিজেই হয়তো সেই ইংরেজি অংশটার সঠিক অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে পারলেন না। অগত্যা অনেকক্ষণ পরে তর্জমা করে দিলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, বুঝতে পেরেছ?

7

​আমি বললুম, কিছুই না। তিনি বললেন, আচ্ছা আমি তোমার বইখানা বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি, একবার পড়ে ভালো করে বুঝিয়ে দেব।

বইখানা নিয়ে গেলেন সত্যি, সেটা আমায় ফিরিয়েও দিলেন যথাসময়ে; কিন্তু আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। কথাটা কাকাকে বলতে তিনি বললেন, আচ্ছা কেমন পড়ায় তা আমি দেখছি।

পরের দিন থেকে তিনি আমাদের কাছে বসে পড়া শুনতে লাগলেন। মাস্টারমশাইয়ের পড়ানোর তিনি প্রায়ই ভুল ধরতেন।

এসব ক্ষেত্রে মাস্টারমশাই কোনো কথা বলতেন না বড়ো-একটা। কাকাকে তিনি বেশ সমীহ করে চলতেন।

তিনি বড়ো একটা বুদ্ধির অঙ্ক কবতে পারতেন না। একদিন কাকার সামনে তিনি একটা অঙ্ক এক্স দিয়ে কষছিলেন। কাকা বললেন, সব গোলমাল হয়ে গেল মাস্টারমশাই!

তিনি বললেন, কেন?

কাকা বললেন, ও অঙ্ক তো অ্যালজেব্রার প্রসেস অনুযায়ী আপনি করতে পারবেন না!

8

​যাই হোক, তিনি কিন্তু কোনো উপায়েই আমায় অঙ্কটা বুঝিয়ে দিতে পারলেন। তিনি চলে যাবার পর কাকা বললেন, মাস্টার তত সুবিধের নয়।

এমন সময়ে বিশ্বকর্মা পূজা এল। আমরা বললুম, মাস্টারমশাই, আমাদের ঘুড়ি লাটাই কিনে দিতে হবে।

তিনিও রাজি হলেন, কারণ তিনি সম্প্রতি মাইনে পেয়েছিলেন।

বিশ্বকর্মা পূজার দিনচারেক পর একদিন শ্রীনাথ দাস লেনে মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে দেখা। আমি নমস্কার করলুম। তিনি বললেন, এই যে, পিন্টুযে! কোথায় চলেছ?

আমি বললুম, আপনি কোথায় থাকেন মাস্টারমশাই?

তিনি বললেন, এইখানেই।

—চলুন না দেখে আসি।

media

9

​কী জানি কেন মাস্টারমশাইয়ের বাড়ি দেখবার জন্যে আমি অত্যন্ত উতলা হলুম। মাস্টারমশাই আমায় বসিয়ে ‘আসছি’ বলে কোথায় চলে গেলেন সহসা। আর আমি তাঁর ঘরঘানা ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলুম। ঘরের মধ্যে আর একখানা কাপড়ও নেই। যদিও-বা একখানা আছে, তাও শতছিন্ন এবং অত্যন্ত কালো। একটি জামা ও একখানিমাত্র কাপড়ে তাঁকে দিন কাটাতে হয়। আমার বড়ো অনুকম্পা জাগল তাঁর প্রতি। তাঁকে যে আমি এত ঘৃণা করতুম তা একেবারে বিস্মৃত হলুম। হঠাৎ যেন আমি একেবারে বদলে গেলুম।

media

10

​এমন সময়ে মাস্টারমশাই একঠোঙা খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। আমি ব্যথিত সুরে বললুম, ওসব আবার কেন মাস্টারমশাই?

আমি বুঝলুম যে তাঁর শ্রমের পারিশ্রমিকটা এমন করে অপচয় করা তাঁর শরীরের বিন্দু বিন্দু রক্ত গ্রহণ করার শামিল। আমি তীব্র প্রতিবাদ করলুম, না, এ কখনো হবে না।

বাড়ি ফেরার পথে সেদিনই আমি প্রতিজ্ঞা করলুম যে মাস্টারমশাই যাতে আমাদের জন্যে তাঁর মাইনে থেকে কিছু খরচ না-করেন তার ব্যবস্থা করতে হবে। হাজার হোক বেচারা ওই ক-টি টাকা। সম্বল করে কলকাতায় বাস করছেন।

media

11

​মেজোকাকা একদিন আমার ট্রানস্লেশনের খাতাখানা দেখতে দেখতে মাস্টারমশাইকে বললেন, এসব কী পড়াচ্ছেন মাস্টারমশাই। ইংরেজি আপনি দেখছি কিছুই জানেন না।

এর পর আর আপনাকে রাখতে আমি সাহস করি না। আপনার বাকি মাইনেটা দু তারিখে নিয়ে যাবেন।

মেজোকাকার কথায় মাস্টারমশাই একটি প্রতিবাদ পর্যন্ত করলেন না, নীরবে নিঃশব্দ পদক্ষেপে প্রস্থান করলেন। আমি তাঁর মুখের দিকে তাকাতে পারলুম না। এর জন্যে দোষী তো আমি।

media
media

বিধু মাস্টার

By Srilekha Kumar

media

Show answer

Auto Play

Slide 1 / 11

SLIDE